সম্পাদকীয় ডেস্ক :

তিনি এমনই একজন, যিনি দেশের জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেন, দেশের স্বার্থে নিজের শরীর-পরিবার সবই তুচ্ছ তার কাছে। তিনি এমনই একজন, যিনি ভুলে যান না আমাদের মূল প্রেরণার উৎস একাত্তর। তাই বিশেষ বিশেষ মূহূর্তে টেনে আনেন একাত্তর আর আর সেই অগ্নিঝরা সময়ের বীর যোদ্ধাদের।

তিনি এমনই একজন, যিনি দেশের জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেন, দেশের স্বার্থে নিজের শরীর-পরিবার সবই তুচ্ছ তার কাছে। তিনি এমনই একজন, যিনি ভুলে যান না আমাদের মূল প্রেরণার উৎস একাত্তর। তাই বিশেষ বিশেষ মূহূর্তে টেনে আনেন একাত্তর আর আর সেই অগ্নিঝরা সময়ের বীর যোদ্ধাদের। তিনি সতীর্থ অন্তপ্রাণ। নিজেকে আড়ালে রেখে সহযোদ্ধাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকেন। তিনি আশ্চর্য নেতৃত্বগুণে পুরো দলকে, পুরো দেশকে উজ্জীবিত করে তোলেন।

এমন যাদুকরী যার দক্ষতা, দেশের প্রতি এমন যার দরদ- তাকে কেবলই একজন ক্রিকেটার ভাবা তো অন্যায়ই বটে! তিনি তো আমাদের নেতা। তিনি আমাদের মাশরাফি।

বাংলাদেশ এই দলটাতে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আছেন, আছেন ড্যাশিং ওপেনার তামিম, আশ্চর্যরকমের ধারাবাহিক পারফর্ম করা মুশফিক আছেন। আছেন ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন এমন অনেক তারকাই। কিন্তু মাশরাফি একজনই। যিনি একেবারে আদর্শ নেতা!

মাশরাফির পায়ের কাঁটাছেড়ার কাহিনী সকলেরই জানা। পায়ে হাঁটু বলে বোধহয় আর কিছুর অস্থিত্ব নেই। এমন ইনজুরি নিয়ে কেউ আর খেলার মাঠে নামার সাহস দেখায় না। বড়জোর ধারাভাষ্যকার হয়ে অন্য দলের গিবত গেয়ে বেড়ায়। হাড়গুড় ভাঙ্গার হবু ডাক্তারদের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের উত্তম অনুসঙ্গ হতে পারতো তাঁর পা জোড়া।

কিন্তু তিনি মাশরাফি বলেই, তিনি অদম্য বলেই, দেশের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার দৃঢ়সংকল্প বলেই ইনজুরিকে বারবার বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মাঠে ফিরে আসেন নড়াইল এক্সপ্রেস। জ্বলে উঠেন স্বমহিমায়। মাশরাফি যেনো কিছুতেই হার না মানা বাঙালি মানসিকতারই সর্বোৎকৃষ্ট প্রতিরুপ। জ্বলে পুড়ে মরে ছাড়খার হওয়ার পরও মাথা নত না করা বাঙালির প্রধান পতাকাবাহী।

বাংলাদেশ যখন অস্ট্রেলিয়ায় বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুত করে নিচ্ছে নিজেদের তখন খবর গেলো মাশরাফির একমাত্র ছেলে গুরুতর অসুস্থ। এ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিজের প্রাণাধিক প্রিয় ছেলের এমন অসুস্থতার সময়েও অবিচল নেতা। দেশের উপর ছেলের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ভার তুলে নিলেন নিজের কাঁধে। ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো ফুসরতই নেই যে তার। তার মাথায় তো এখন শুধুই দেশ। শুধুই বিশ্বকাপ।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচেও মাঠে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটছিলেন মাশরাফি। তবু বোলিং রানআপের সময় কোন এক আশ্চর্য মন্ত্র বলে উড়ে গেলো পায়ের ব্যাথা, খুড়ানো-টুড়ানো। একের পর এক অগ্নিগোলক ছুঁড়তে লাগলেন ম্যাশ। এতে ভস্মিভূত হলেন ইংলিশ মিডলঅর্ডারের দুই স্তম্ভ। তারচেয়েও বড় কথা ব্যাটিং পাওয়ার প্লের সময় ইংলিংশ ব্যাটসম্যানদের জন্য রীতিমত আতঙ্ক হয়ে দেখা দিলেন বাংলাদেশী কাপ্তান। সম্ভবত এই বিশ্বকাপে ব্যাটিং পাওয়ার প্লে’র সময় সবচেয়ে কৃপন স্পেল করলেন মাশরাফি। এসব হিসেব নিকেশ বোদ্ধাদের জন্য তোলা থাক। আমাদের বয়েই গেছে হিসেব নিকেশে।

তারচেয়ে আসুন ম্যাচের শেষ সময়টার দৃশ্য কল্পনা করি। সোমবার ইংল্যান্ডের সর্বশেষ উইকেটটি যখন তুলে নিলেন রুবেল, অ্যাডিল্যাড থেকে সিলেটের আম্বরখানা গর্জে উঠলো একসাথে, মাশরাফি তখন সটান হয়ে শুয়ে পড়লেন মাঠে। নিজের সাথে হয়তো বোঝাপাড়া করে নিলেন কয়েক মূহূর্ত। জাস্ট কয়েক মূহূর্তই। এরপর উঠেই নড়াইল এক্সপ্রেসের চিরচেনা সেই ভোঁ-দৌড়। দুই হাত দুই দিকে প্রসারিত করে।

ম্যাচ শেষে পুরুষ্কার বিতরণী মঞ্চে যখন এলেন তখন তাঁর চোখ জোড়া লাল। মাথায়ও লাল-সবুজ। বাংলাদেশের পতাকা। যুদ্ধ করে পাওয়া এই পতাকা তো এমন বীর যোদ্ধার মাথায়ই মানায়।

ইংল্যান্ড বধের আবেগের অতিশয্যে মাশরাফি ভুলে গেলেন না এটি মার্চ মাস। বাঙালির উত্তাল মার্চ। তাই এই ঐতিহাসিক বিজয়টি উৎসর্গ করলেন মুক্তিযোদ্ধাদের। যেনো এক প্রজন্মের যোদ্ধা আরেক প্রজন্মের যোদ্ধাদের প্রতি তাঁর ঋণ পরিশোধ করছেন। ভুলে গেলেন না সমর্থকদেরও। ‘এই জয়টি আমাদের সমর্থকদের জন্যও। সুসময়, দুঃসময় সব সময়ই তাঁরা পাশে থাকেন।’-বললেন মাশরাফি।

এসময় তামিমের অতিগুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ মিসের প্রসঙ্গ আসতেই মাশরাফি বললেন, ‘তামিম আমাদের সেরা ফিল্ডারদের একজন। আমার মনে হয় সে নিজেও ওই ক্যাচ ফেলে দিয়ে অনুতপ্ত। তবে ম্যাচটা আমরাই জিতেছি। এটাই বড় কথা।’

মাশরাফি এমনই। কিংবা বলা ভালো এই হলেন মাশরাফি। আমাদের এক হার না মানা যোদ্ধা। আমাদের নেতা।

এসব অতিমানবীয় গুণাবলীর কারনেই মাহমুদুল্লাহ, রুবেল, মুশফিকদের ম্যাচেও আলোচনায় মাশরাফি। বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য থেকে শুরু করে ভক্তদের ফেসবুক স্ট্যাটাস সর্বত্রই চলছে মাশরাফিবন্দনা।

ফেসবুকে অনেক ভক্তই মন্তব্য করেছেন, ‘আমরা জন্মেছিলাম মাশরাফির সময়ে।’ প্রকৃত নেতার জন্যই তো বরাদ্ধ থাকে এমন স্তুতিবাক্য।