অঘোর মন্ডল  :

বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোর ইতিহাস ঘাটলে মানে হবে; সেগুলো যেন এক একটা সৌধ। কিন্তু তারপাশে গণতন্ত্র ভাঙাচোরা কোন স্থাপত্য। অযত্ন-অবহেলায় জীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। বাঙালির গণতান্ত্রিক সভ্যতার এক বড় বৈশিষ্ট্য। যা জাতির এক দুঃখজনক অভিজ্ঞতাও বটে।

সাতচল্লিশ বছরের বাংলাদেশের ইতিহাস ছাপিয়ে আরো পেছনে গেলে দেখা যায়; গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বাঙালি যতো সোচ্চার, যতোটা নিবেদিত, যত এনার্জি, মস্তিষ্ক আর ট্যালেন্ট খরচ করছে তার ছিটেফোটাও খরচ করেনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে।

 ‘রাজনীতি আর্ট বা শিল্প। কিন্তু রাজনীতিবিদদের শিল্পীর চেয়ে বেশি হতে হয় মানুষের ডাক্তার। রোগীর শরীর স্পর্শ না করেও তার হৃদস্পন্দন মেপে ফেলার ক্ষমতা থাকতে হয় রাজনীতিবিদদের। এই বুঝতে পারার ক্ষমতা যার যত বেশি তিনি রাজনীতিতে তত ভাল সৌধ বা মনুমেন্টের স্রষ্টা হয়ে থাকবেন। ’ 

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্ত, কার্যকর করার ক্ষেত্রে তারা কেন যেন নির্জীব। সাদা চোখে তার ব্যাখ্যা, এই জায়গায় বাঙালি স্বার্থান্ধ। দলকানা। দলতন্ত্রেও উর্ধ্বে উঠতে চেষ্টা করেনি। এখনও এদেশের রাজনীতিবিদ থেকে সাধারণ মানুষের কাছে গণতন্ত্র মানে-ভোট। নির্বাচন ছাড়া তাদের কাছে গণতন্ত্রের অন্য কোন মাত্রা কিংবা কার্যকারিতা আছে, সেটা তারা ভাবতে পারেন না!

বাঙালির সেই ভোট গণতন্ত্রে বহুদিন ধরে জোট নামক অনুষঙ্গ ঢুকে পড়েছে। সেটা দারুণ সক্রিয় নির্বাচনী মাঠে। ভোট আর জোট বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঐতিহাসিক ভাবে কুড়িয়ে পাওয়া দুটো যমজ শব্দ। চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট। তাদের ঐতিহাসিক জয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য পাক সামিরক শাসন সেই ফ্রন্টকে খুব বেশি দিন স্থায়িত্ব দেয়নি। তারপর সত্তরের নির্বাচন। এককভাবে আওয়ামী লীগ জয়ী হলো। সেই রায়ের ভিত্তি করে মুক্তিযুদ্ধের সময় তারাও কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপসহ কয়েকটা দলের সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধে জোটবদ্ধ করেছিল। যা জাতীয় ঐক্য আর স্বাধীনতা যুদ্ধকে আরো বেগবান করেছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সংসদ নির্বাচনে সেই একতা বা জোটবদ্ধতার প্রয়োজন ক্ষমতাসীনরা অনুভব করেননি। করলেন বাকশাল গঠনের সময়। ইতিহাস বলে সেই সময়ের প্রেক্ষাপট এবং রাজনৈতিক চিত্রনাট্য এমনভাবে লেখা হলো যে বামদের বড় একটা অংশের আওয়ামী লীগের সঙ্গে না গিয়ে কোন পথ ছিল না তাদের সামনে।

পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে উর্দি পরে সামরিক শাসকরা যখন দল গড়া শুরু করলেন, তখন নাম সবর্স্ব দলগুলোকে কুড়িয়ে আনা শুরু হলো। প্রথমে ফ্রন্ট তারপর তাদের নিজেদের নতুন দলে আত্মস্থ করে ফেলা! জিয়া এবং এরশাদ দুজনেই একই ফরমুলায় একই পথে দল গড়েছেন। দল ভেঙেছেন।

আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির নতুন মেরুকরণে জোট-মহাজোট, জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট, যুক্তফ্রন্ট অনেক কিছু হচ্ছে। ভাঙছে। তাতে আবার অনেকের দুশ্চিন্তা বাড়ছে। কেউ আত্মপ্রশান্তি খুঁজে পাচ্ছেন। সংবাদ মাধ্যমে এই সব জোট-ফ্রন্ট নিয়ে আলোচনা প্রাধান্য পাচ্ছে। গণমাধ্যমের সামনে কথা বলার সুযোগে রাজনীতিবিদরা কে যে কখন কি বলছেন, সেটা বোঝা দায়।

কারো কথা শুনে মনে হচ্ছে; তারা আগামীতে ক্ষমতায় চলে আসছেন। দেশ শাসনের ভার পাচ্ছেন। আর শাসন ক্ষমতায় আসা মানে সাধারণ মানুষ থেকে গণামাধ্যমকর্মী সবাইকে নিজেদের চাকরবাকর-কর্মচারী ভাবতে শুরু করেছেন। অগণতান্ত্রিক সরকারের ক্ষমতার সামান্য উচ্ছিষ্ট পেয়ে যারা আত্মতুষ্টিতে ভুগছিলেন, তারা এখন আবার ক্ষমতার অংশীজন হওয়ার স্বপ্নে বিভোর।

স্বপ্নজালে বন্দী অবস্থায় মানুষের চারিত্রিক সনদপত্র বিতরণ করে বেড়াচ্ছেন ডিজিটাল জমানায় টেলিভিশনের সৌজন্যে! ভোট কাছাকাছি এসেছে ঠিক আছে। কিন্তু ক্ষমতা দূরবীন দিয়ে দেখতে পাচ্ছেন কি না সেই সংশয় আবার অনেকের মনে। তবে মনে মনে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভোগের আত্মপ্রসাদে ভোগা লোকেরও অভাব হচ্ছে না। সেটা জোট-ফ্রন্ট, ঐক্যে নামক শব্দগুলোর সৌজন্যে!

প্রতিযোগিতামূলক স্পোর্টসে একটা কথা চালু আছে। আপনি যত খেলবেন তত আপনার ওপর চাপ বাড়বে। কারণ, প্রতিদ্বন্দ্বিরা আপনাকে ততদিনে ভালমত জেনে যায়। সমালোচকরাও আপনাকে মেপে ফেলেন। রাজনীতি নামক খেলায় কম স্কিলফুল খেলোয়াড় যদি বেশি খেলতে চান, তখন সেটা নিজের, দলের, জোট বা ফ্রন্টের জন্য বিপদ ডেকে আনে। তখন অধিনায়ক, কোচদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায় সেই সব খেলোয়াড়।

কোচ ভাল ট্যাকটিশিয়ান হলে মাঠ থেকে তাকে তুলে নেন। আবার ক্রিকেট মাঠ হলে অধিনায়ক নিজে সেই সব খেলোয়াড়কে ‘ইয়েস কল’ দিয়ে উইকেটের মাঝপথে এনে ‘নো’ জানিয়ে রানআউট করে প্যাভিলিয়নে পাঠান। জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টে সেরকম দু’একজনকে তুলে নেয়ার সময় হয়েছে। অথবা রান আউ করতে হবে।

আবার ভোট আর রাজনীতির এই সব ম্যাচে ফ্রন্ট বা জোট থেকে দু একটা দল বা দু’একজন বেরিয়ে গেলে ম্যাচ জিতে গেছি ভেবে উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই। একটা-দুটো উইকেটের পতন দেখেই ক্ষমতাসীন জোট আর দলের অনেকে রসিকতা করছেন। ‘ কেবল তো দুই উইকেটের পতন হলো! আরো দেখবেন!- গোছের কথাবার্তা বলে অনেকে জনগণের কাছে কি বার্তা দিতে চাইলেন, সেটা আরো একটু ভাল করে রিভিউ করা উচিত।

যেসব উইকেটের পতন হলো তারা আসল ব্যাটসম্যান কি না সেটা বোঝার চেষ্টা করা দরকার। ভাবা উচিত অন্য প্রান্তে কোন একজন দাঁড়িয়ে গিয়ে হারা ম্যাচ বের করে না নিয়ে যায়। তাহলে এখন যতো হাসিমুখে উইকেট পতনের কথাটা বলা যাচ্ছে, শেষে হতাশার প্রতীক হয়ে যেতে না হয়। নতুন করে রাজনীতির পাঠশালায় যেতে না হয়।

মিডিয়ায় প্রতিপক্ষ নিয়ে বেশি শব্দ খরচ করে তাদের গুরুত্ব বাড়ানোর চেয়ে সরকার দলের মন্ত্রী-এমপিদের উচিত তারা যা করলেন, সেগুলো নিয়ে কথা বলা। নিজেদের সাফল্য তুলে ধারার পাশাপাশি ব্যর্থতার কথা স্বীকার করা। জনগণ এখন মিডিয়ার সৌজন্য আপনাকে খুব দ্রুত মেপে ফেলার সুযোগ পাচ্ছে।

রাজনীতি আর্ট বা শিল্প। কিন্তু রাজনীতিবিদদের শিল্পীর চেয়ে বেশি হতে হয় মানুষের ডাক্তার। রোগীর শরীর স্পর্শ না করেও তার হৃদস্পন্দন মেপে ফেলার ক্ষমতা থাকতে হয় রাজনীতিবিদদের। এই বুঝতে পারার ক্ষমতা যার যত বেশি তিনি রাজনীতিতে তত ভাল সৌধ বা মনুমেন্টের স্রষ্টা হয়ে থাকবেন।

লেখক: সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক।