মোহাম্মদ ঈমাম হোসেইন:

১৯ আগস্ট নোয়াখালীতে ‘গোপালপুর গণহত্যা’ দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন  নোয়াখালী জেলায় সবচেয়ে বড় ও নৃশংস গণহত্যা সংঘটিত হয় বেগমগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের গোপালপুর বাজারে। একাত্তরের ১৯ আগস্ট সকালে তৎকালীন সময়ে রাজাকারে যোগদানকারী স্থানীয় মুসলিম লীগ নেতাকর্মী ও স্বার্থান্বেষীদের সহযোগিতায় ৫৪ জন নিরীহ মানুষকে বাজারের পূর্বপাশ্বের খালপাড়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।

 

হত্যাযজ্ঞ শেষে পাক আর্মি ও রাজাকাররা চলে যাওয়ার পর নিহতের স্বজনরা লাশগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। গণহত্যায় শহীদ হওয়া স্থানীয় ২৪ জনের নাম-পরিচয় সনাক্ত করা যায়। –তাঁরা হলেন, গোপালপুরের মাহবুবুল হায়দার চৌধুরী (নশা মিয়া),  পোস্টমাষ্টার ইসমাইল মিয়াজি, মির্জানগর গ্রামের হাওলা বাড়ীর আবুবকর সিদ্দিক, আবুল কাশেম, তুলাচরা গ্রামের দিন ইসলাম মেম্বার, হাবিবুল্যাহ,  সাহাদাপুর গ্রামের অহিত উল্যাহ, মোহাম্মদ উল্যাহ, দুলাল মিয়া, আটিয়াকান্দি গ্রামের সামছুল হক মাষ্টার, মজিবুল্যাহ, বশির উল্যাহ, দেবকালা গ্রামের হারিস মিয়া, সিরাজউদ্দিনপুর গ্রামের সিদ্দিক উল্যাহ, মহবুল্যাপুর গ্রামের মনতাজ মিয়া, নুর মোহাম্মদ, আবদুল মান্নান, মমিন উল্যা, পানুয়াপাড়া গ্রামের মোবারক উল্যাহ, চাঁদ কাশিমপুর গ্রামের মোহাম্মদ উল্যাহ, দর্জি (টেইলারি দোকানের মালিক) আমিরাবাদ গ্রামের আবদুর রশিদ, বারাহী নগর গ্রামের আব্দুস ছাত্তার, হিরাপুর গ্রামের আবদুল করিম এবং দশ গরিয়া গ্রামের ডাক্তার মোঃ সুজায়েত উল্যা ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্বাস্থ্য সহকারী।

তাদের নামে স্বাধীনতার ১৭ বছর পর ১৯৮৮ সালে ইউনিয়ন সদর বা কেন্দ্রস্থল গোপালপুর বাজারে স্থাপিত হয় শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। সে সময়ে স্থানীয়ভাবে সংগঠিত জনতা ক্লাবের উদ্যোগে এবং পরবর্তীতে জেলা পরিষদের অর্থায়নে তৈরি স্মৃতি¯ম্ভটি ৭১-এর সেই লোমহর্ষক গণহত্যার একমাত্র নিদর্শন।

নোয়াখালীর চৌমুহনী-লক্ষ্মীপুর মহাসড়কের  বাংলাবাজার থেকে উত্তরে বেগমগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর বাজার। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এই বাজার ছিল নোয়াখালীতে মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম রিক্রুটিং ও ট্রেনিং সেন্টার।

মুক্তিযুদ্ধের সময় সুবেদার লুৎফর রহমানের নেতৃত্বে সেখানে চলতো মুক্তিসেনাদের প্রশিক্ষণ। তৎকালীন ছাত্রনেতা মোস্তাফিজুর রহমান (পরবর্তীতে জাসদনেতা ও বৃহত্তর বেগমগঞ্জের এমপি ), লকিয়ত উল্যাহ, হায়াত খান, ডা. আনিসুল ইসলাম, আব্দুল বাতেন, ইউপি সদস্য নজীর আহম্মেদ মেম্বার, হাবিলদার জোবেদ আলী, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর রহিম, জাহাঙ্গীর হোসেন পাটোয়ারী, অ্যাডভোকেট ফজল কবির, নৌবাহিনীর আব্দুল খালেক, আব্দুল নোমান, নুরুল আমিন চৌধুরী, মোস্তফা মহসিন দুলাল, মাহমুদুল হাসান চৌধুরী, জাকির হোসেন, আবু কায়েস মাহমুদসহ অনেকে তখন এই ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষক ছিলেন।

উপজেলা সদরস্থ বেগমগঞ্জ সরকারি কারিগরি উচ্চবিদ্যালয়ে(চৌরাস্তা টেকনিক্যাল হাইস্কুল) স্থাপিত সেনাক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের এই ঘাঁটিতে আক্রমণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে পাক আর্মিরা।

গোপালপুর আক্রমণের লক্ষে স্থানীয় স্বার্থান্বেসী কিছুলোক ও সে সময়ের স্থানীয় মুসলিম লীগ নেতাকর্মীদের দালাল নিয়োগ করে পাকআর্মিরা। এদিকে প্রতিদিনই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পাকিস্তানিরা আসছে..। এ নিয়ে স্থানীয় এলাকার বাসিন্দারা সর্বদা উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় থাকতেন।

১৯ আগস্ট ভোরে পাকিস্তানি আর্মিদের বিশাল বহর অবস্থান নেয় বাংলাবাজারের একটু উত্তরে  গোপালপুর ইউনিয়নের সামছুন্নাহার হাই স্কুলে। সেখান থেকে দুভাগে বিভক্ত হয়ে সকাল সাড়ে ৭টা ও পৌনে ৮টার দিকে গোপালপুর বাজারে প্রবেশ করে পাকআর্মি। বাজারের পূর্বপাশ দিয়ে একটি দল এবং বেতুয়াবাজারের মোড় ঘুরে পশ্চিম পাশ দিয়ে আরেকটি দল প্রবেশ করে। তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসেন স্থানীয় রাজাকার নেছার, আব্দুল মতিন, বাতেন, আবু বকর ছিদ্দিক, ইসমাইল, মফিজ উল্যা। এ সময় গোটা বাজার ঘেরাও করে ফেলে তারা।

অন্যদিকে বাইরে অপারেশনে যাওয়ার কারণে গোপালপুর বাজারে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে মাত্র ডা. আনিস সহ কয়েকজন ছিলেন। তারপরও মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানিদের প্রতিরোধ করতে চেয়েছিল।

পাকআর্মি বাজারে আক্রমণ করতে আসার খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে সহায়তাকারী তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নসা মিয়া ভোরে বাজারে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের সরে যাওয়া ইঙ্গিত দেন। পাশাপাশি বাজারের ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষকে দ্রুত বাজার ত্যাগ করতে বলেন।

ডা. আনিস সহ মুক্তিযোদ্ধরা বাজার থেকে সরে যাওয়ায় পাকিস্তানি সেনারা গোপালপুর বাজারে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা তৎক্ষণাৎ পায়নি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পাক আর্মিরা বাজারে এদিক ওদিক তল্লিশি শুরু করে। তখনো বাজারে স্থানীয় দোকানদারসহ জরুরী প্রয়োজনে প্রায় দুই শতাধিক সাধারণ মানুষ অবস্থান করছিল।

সকাল ৮টার দিকে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মুসলিম লীগ নেতা মাহবুবুল হায়দার চৌধুরী (নসা মিয়া), ও স্থানীয় সাব পোস্ট অফসিরে পোস্টমাষ্টার ইসমাইল ময়িজি পাকিস্তানী আর্মির সদস্যদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের কোন ট্রেনিং বা তৎপরতা নেই। তার ধারণা ছিল, তিনি যেহেতু মুসলিম লীগের ইউপি চেয়ারম্যান এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে তার পরিচয় আছে সেহেতু তার কথায় হয়তো পাকসেনারা মানুষের ওপর অত্যাচার, হত্যা কিংবা বাড়াবাড়ি করবে না।

 

কিন্তু রাজাকারদের ইন্ধন এবং প্ররোচণার কারণে ইউপি চেয়ারম্যান ও পোস্টমাষ্টাররে কথা কানেই নেয়নি পাকআর্মিরা। এরপরই পাকিস্তানি সেনা এবং রাজাকারা শুরু করে পুরো বাজারে তল্লাশি। এ সময় নসা মিয়ার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পাশের একটি ঘরে  থেকে গুলির খোসা এবং মোহাম্মদ উল্যার দর্জির দোকান থেকে একটি বাংলাদেশের পতাকা পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে পাকিস্তানি সেনারা।

 

এরই মধ্যে বিভিন্ন দোকান থেকে লোকজনকে ধরে এনে বর্তমানে ব্যাংকের পূর্বপাশের খালি জায়গায় জড়ো করতে থাকে। পাকআর্মিরা এ সময় নসা মিয়াকেসহ ইউপি সদস্য দীন ইসলাম, ব্যবসায়ী ছিদ্দিক উল্যা, তার দোকানের কর্মচারী হাবিব উল্যা, মোহাম্মদ উল্যা দর্জিকে বাজারের মাঝখানেই বেধড়ক পিটুনি ও মারধর  করে।

 

সকাল ১০টা নাগাদ জড়ো করা প্রায় ২৫০ জন লোকের মধ্য থেকে নসা মিয়াসহ ৫৬ জনকে বাজারের পূর্বদিকের রাস্তায় খাল পাড়ে দাঁড় করায় এবং বাজারে আগুন ধরিয়ে দেয় পাকআর্মি ও রাজাকাররা।

 

নসা মিয়া তখন লাইনে দাঁড় করানো ৫৬ জনের মধ্য থেকে তাদের চৌধুরবাড়ী মসজিদের ইমাম হাফেজ আজিজুর রহমান এবং গোপালপুর পোস্ট অফিসের পোস্টম্যান আব্দুল মান্নানকে ছেড়ে দেওয়ার আবেদন করেন পাক সেনাদের কাছে। নসা মিয়ার অনুরোধে উপরোক্ত দুজনকে ছেড়ে দিলেও নসা মিয়ার শেষ রক্ষা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতার কারণে লাইনে নসা মিয়াসহ বাকি ৫৪ জনকে খালের দিকে মুখ ফিরায়ে দাঁড় করানো হয়। পরে সবাইকে একসঙ্গে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। সৌভাগ্যক্রমে গুলিবিদ্ধ অবস্থায়ই শুধুমাত্র একজন বেঁচে যান। পাক সেনারা চলে যাওয়ার পর দুপুর ১২টার দিকে পর্যায়ক্রমে শহীদদের স্বজনেরা মরদেহ নিতে আসে।

 

শহীদদের তাজা রক্তে লাল হয়ে যায় বর্ষার খালের পানি। শহীদদের মরদেহ সমাহিত হয় স্ব স্ব শহীদের পারিবারিক কবরস্থানে। এ জন্য অনেকের নাম পরিচয় তখন শনাক্ত করা যায়নি। লাইনে দাঁড়ানোর পরও নসা মিয়ার অনুরোধে সেদিন বেঁচে যাওয়া হাফেজ আজিজুর রহমানের ভাষ্যমতে, এমনিতেই প্রতিদিন শোনা যেতো পাকিস্তানিরা আসছে, আসছে।

১৯ আগস্ট সকাল সাড়ে ৭টার দিকে যখন গোপালপুর বাজারের দুই পাশ দিয়ে পাকিস্তানিরা আসে তখন তাদের অগ্রভাগে ছিল রাজাকার। বাজারের পশ্চিম প্রান্তের প্রাইমারি স্কুলের মাঠ পেরিয়ে যখন বাজারের দিকে যাচ্ছিলাম। তখন পদিপাড়ার রাজাকার নাজিম বলেন, ‘এই দাঁড়াও’। আমি দাঁড়াইনি, ইতোমধ্যে মানুষের জটলা বেঁধে গেলে আমি বলি, ‘সবাই ভাগো’।
মানুষজনকে চলে যেতে বলায় আমাকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে বাজারের মাঝখানে পাকিস্তানি সেনাদের কাছে তুলে দেয়। পাকসেনারা মনে করে আমি মুক্তিফৌজের কমান্ডার। তারা আমাকে চেক করে, এমন সময় দেখি কাপড়ের দোকান থেকে একটা ছেলেকে বের করে এনে অমানবিক নির্যাতন করে।

 

বাজার থেকে রাজাকার আর পাকসেনারা ১৩০ জনকে বের করে বর্তমানে ব্যাংকের পূর্বপাশের খালি জায়গায় জড়ো করে। সেখান থেকে আমাদের নিয়ে যায় খাল পাড়ে। এ সময় মাহবুবুল হক চৌধুরী (নসা মিয়া) এসে পাকসেনাদের অনুরোধ করে এখানে কোনো মুক্তিযোদ্ধা নেই, এরা সবাই বাজারে খুচরা ব্যবসা করে। এরা নিরীহ জনসাধারণ। এদের ছেড়ে দেন।

 

এমন সময় বর্তমানে ব্যাংকের পূর্বপাশের একটি কাপড় দোকান থেকে বাংলাদেশের পতাকা বের করে আনে কয়েকজন পাকসেনা। এতে কমান্ডার উত্তেজিত হয়ে নসা মিয়াকে মারধর করে এবং কাপড়  দোকানদারের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায়।রাজাকার এবং পাকআর্মিরা বাজার তল্লাশি করে প্রায় ২৫০ জনকে জড়ো করে খালপাড়ের দিকে নিয়ে যায়। সেখান  থেকে ৫৬ জনকে বেছে লাইনে দাঁড় করায় খাল পাড়ে। নসা মিয়ার অনুরোধে আমাকে এবং পোস্টম্যান আব্দুল মান্নানকে  ছেড়ে দেয় তারা।

 

আমি যখন হেঁটে বাজার পার হচ্ছিলাম তখন দেখতে পাই, লাইনে দাঁড়ানো ৫৪ জনকে একসঙ্গে ব্রাশ ফায়ার করা হলো। এটি দেখে হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় পড়ে যাই। পরিচিত একজন কসাই আমাকে তুলে বাড়ি যেতে সহায়তা করে। ১২টার দিকে এসে দেখি খাল ভর্তি হয়ে আছে মানুষের লাশ। ভরা বর্ষার খালের পানি রক্তে লাল হয়ে আছে। খালজুড়ে রক্তের বন্যা।

 

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সকলেই মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই নৃশংস গণহত্যায় হত্যার শিকার এসব শহীদ পরিবারকে মুক্তিযোদ্ধাদের মতো রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ সুবিধা দেয়ার দাবিও জানান।

 

শহীদ পোস্টমাষ্টার ইসমাইল মিয়াজির দৌহিদ্র, যমুনা ব্যাংকের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ আনোয়ার হোসেন শিমুল জানান, শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকেগোপালপুর গণশহীদ স্মৃতি সংসদ’ গঠন করা হয়েছে। এ স্মৃতি সংসদের মাধ্যমে প্রতি বছর এ গণহত্যাসহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হবে। তিনি আরো জানান, “এ গণহত্যায় নিহতরা প্রত্যেকে যেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভূক্ত হয় গোপালপুর গণশহীদ স্মৃতি সংসদ’-এর মাধ্যমে আমরা সে প্রচেষ্টাও চালিয়ে যাব।”

— সূত্রঃ মুক্তিযুদ্ধে নোয়াখালীর ইতিহাস ও স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের ভাষ্য|

 

লেখকঃ গবেষক ও সমাজকর্মী, আহবায়ক: নোয়াখালী বিভাগ আন্দোলন।