সুবর্ণচরে গণধর্ষণ: হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে সেই নারী, দেখতে ভিড় দর্শনার্থীদের মামলা তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছে আসামীপক্ষ।

 

বিজে২৪ এক্সক্লুসিভ:

 

ভোটের দিন রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে গণধর্ষণের শিকার পারুলের হাসপাতালে কেটে গেছে ১০ দিন। বর্বর ঘটনার শিকার এ নারীকে দেখতে হাসপাতালে প্রায়ই ভিড় জমাচ্ছেন রাজনীতিবিদ, সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। সংবাদ সংগ্রহের জন্য আসছেন সাংবাদিক ও ফটোসাংবাদিকরা।

 

 

এ বিষয়ে বিবিসি জার্নাল ২৪ ডটকম-কে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান, দর্শনার্থীর ভিড় ও অসতর্কতার কারণে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা সেবা। এতে ওই নারীর পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি) দেখা দিয়েছে।

 

গত ১০ দিনে নোয়াখালী সরকারি জেনারেল হাসপাতালে ধর্ষিত নারীকে দেখতে এসেছিলেন বহু মানুষ। ৩১ ডিসেম্বর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান তার লোকজন নিয়ে হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে তাকে দেখতে যান। ২ জানুয়ারি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক আল মাহমুদ ফাইজুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দল, একই দিন ঢাকা থেকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) অ্যাডভোকেট সেলিনা আক্তারের নেতৃত্বে একটি দল দেখতে যায়।

 

৪ জানুয়ারি সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্সের নেতৃত্বে বাম গণতান্ত্রিক জোট ও একই দিন নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর নির্দেশে সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শিহাব উদ্দিন শাহীন, পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি আব্দুল ওয়াদুদ পিন্টুসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হাসপাতালে যান।

 

৫ জানুয়ারি মির্জা ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বে আ স ম রব, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীসহ পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী তাকে দেখতে হাসপাতালে
যান। ওই সন্ধ্যায় আশরাফুল আলম ওরফে হিরো আলম হাসপাতালে ওই নারীকে দেখতে গেলে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে। কয়েকশ’ মানুষ তার সঙ্গে ছিল। এক পর্যায়ে পুলিশ গিয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

 

একই দিন রাতে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. এম অহিদুজ্জামানের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন কর্মকর্তা ইবনে ওয়াজেদ ইসলাম ইমনসহ একটি দল তাকে দেখতে হাসপাতালে যায়। গত ৬ জানুয়ারি ‘নিজেরা করি’ সংস্থার সমন্বয়ক খুশী কবির তাকে দেখতে হাসপাতালে যান। এ ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণির লোকজন প্রতিদিনই হাসপাতালের কেবিনের সামনে ভিড় জমান।

 

তাদের ছবি নেওয়ার জন্য প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার কমপক্ষে ৫০ জন আলোকচিত্রীও ঢোকেন। এতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়। সম্প্রতি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় এক দল শিক্ষার্থী ওই নারীর পাশে বসে সেলফি নিচ্ছে এবং ফেসবুকে লাইভ প্রচার করছে। ধর্ষিতর ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ায় অনেকটা বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে পরিবারটি। তবে ওই নারীর নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক দু’জন নারী ও দু’জন পুরুষ সদস্য নিয়োজিত থাকলেও ভেতরে প্রবেশে তাদের বাধা দিতে দেখা যায়নি।

 

নোয়াখালী সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. খলিলুর রহমান বিবিসি জার্নাল২৪ ডটকম-কে  বলেন, অধিক হারে নির্যাতন, বেশি রক্তক্ষরণ ও অতিরিক্ত লোকজনের পরিদর্শনের কারণে ওই নারীর পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি) দেখা দিয়েছে। এর ফলে নির্যাতিতার মানসিক ভারসাম্য হারানোর লক্ষণ দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া তার শরীরের ক্ষতস্থানে সংক্রামক রোগ দেখা দিয়েছে।

 

তার উন্নত চিকিৎসার জন্য মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডের প্রতিবেদন ও পরামর্শ মোতাবেক চিকিৎসা দেওয়া হবে। বোর্ড মনে করছে, উন্নত চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও মহাপরিচালক স্বাস্থ্য দপ্তরের সঙ্গে পরামর্শ করে ঢাকায় রেফার করা হবে। ওই নারীর কেবিনে দর্শনার্থীদের ভিড় না করার জন্য পরামর্শ দেন তিনি।

 

গতকাল মঙ্গলবার নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের ৮ নম্বর কেবিনে গিয়ে দেখা যায় গণধর্ষণের শিকার গৃহবধূ দাঁড়াতে পারছেন না। তিনি বলেন, তার ডান পা অবশ হয়ে আসছে। কোমর থেকে নিচের দিকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করছেন। খাবার গ্রহণে অরুচি দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, ঠিকমতো ঘুমাতে পারছি না। একটু ঘুম এলেই দর্শনার্থীদের প্রবেশের কারণে ঘুম ভেঙে যায়। তখন মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে। আমার একটু বিশ্রাম দরকার।

 

 

ধর্ষিত নারীকে দ্রুত ঢাকায় এনে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওটিসি) ভর্তির পরামর্শ দিয়ে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বলেন, আমি ওই নারীকে দেখতে গিয়েছিলাম; তার সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা তাকে আইনি সহায়তা দেব। তবে তিনি প্রচণ্ড মানসিক ট্রমার মধ্যে আছেন। তার চোখেমুখে ভয় ও লজ্জা কাজ করছে। এমন অবস্থায় তাকে ঢাকায় এনে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত। চিকিৎসার পাশাপাশি তাকে কাউন্সিলিং করলে শারীরিক ও মানসিক ভাবে সুস্থ হয়ে উঠবেন।

 

 

ধর্ষিত নারীকে দেখতে গিয়ে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া সম্পর্কে সালমা আলী বলেন, এটা নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। আমরা নোয়াখালীর প্রশাসনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছি। এ বিষয়ে তারা ব্যবস্থা নেবে বলে আমাদের আশ্বস্ত করেছে।

 

 

এদিকে গৃহবধূর স্বামী মামলার বাদী বলেন, তিনি মামলার আসামিদের ও ঘটনার মূল হোতা রুহুল আমিনের স্বজনদের অব্যাহত হুমকির মুখে এলাকায় যেতে সাহস পাচ্ছেন না। গত রোববার এলাকায় গেলে আসামিদের স্বজন মধ্যবাগ্যা গ্রামের সেলিম মিয়া, তাজল ও আব্দুর রব ডাক্তার তাকে মামলা তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। নতুবা তাকে পরিবার-পরিজন নিয়ে এলাকাছাড়া করার হুমকি দেয়।

 

এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মো. জাকির হোসেন বিবিসি জার্নাল  ২৪ ডটকম-কে বলেন, মামলার বাদীকে কেউ হুমকি দিয়ে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তবে তার পরিবারের কোনো নিরাপত্তাজনিত সমস্যা নেই বলে জানান তিনি।

 

গত ৩০ ডিসেম্বর ওই নারী ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে গেলে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। ওই রাতে ১০-১২ জনের একদল যুবক ঘরে ঢুকে প্রথমে স্বামী-স্ত্রী দু’জনকে মারধর করে। পরে স্বামী ও সন্তানদের বেঁধে রেখে ওই নারীকে ঘরের বাইরে নিয়ে গণধর্ষণ করে। পরদিন ওই নারীর স্বামী নয়জনের নাম উল্লেখ করে চরজব্বার থানায় একটি মামলা করেন। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনসহ ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

 

                                বিজ্ঞাপন অংশ