দুই মালিককে খুঁজে না পাওয়ায় অন্যদের গ্রেফতার করছে না পুলিশ

 

অনলাইন ডেস্ক:

 

রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হাজি ওয়াহেদ ম্যানশনের দুই মালিক মো. হাসান ও সোহেল ওরফে শহীদকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের পাঁচদিনেও দোষী কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি তারা। এ বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য- দুই মালিককে খুঁজে না পাওয়ায় অন্যদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না।

 

চকবাজারের ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মোট ৬৭ জন মারা গেছে। মৃত্যুশয্যায় রয়েছে আরও কয়েকজন। এই ঘটনায় কয়েকটি পক্ষ ও গোডাউনের মালিক জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও তাদের কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।

চকবাজার থানায় দায়ের করা ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর মুরাদুল ইসলাম বিবিসি জার্নালকে বলেন, ‘ওই দুজনকে গ্রেফতার করতে পারিনি। যে কারণে অন্য আসামিদেরও ধরতে পারছি না।’

 

চুড়িহাট্টার স্থানীয়রা বলছেন, ওয়াহেদ ম্যানশনের দুই মালিকের একজন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার দিন চট্টগ্রামে ছিলেন। আগুনের সংবাদ শুনে তিনি সেই রাতেই ঢাকায় আসেন। পরেরদিন সকালে আবারও ঢাকার বাইরে চলে যান।

 

এ বিষয়ে ডিএমপির লালবাগ বিভাগের সহকারী কমিশনার (এসি) সিরাজুল ইসলাম বিবিসি জার্নালকে বলেন, ‘আসামিদের ধরার জন্য তদন্ত সংশ্লিষ্টরা সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা করছেন। আসামিদের মোবাইল ফোনের কল ডিটেইলড রেকর্ড (সিডিআর) বের করা হয়েছে। সেটা ধরে অবস্থান নিশ্চিত হয়ে তাদের গ্রেফতারের চেষ্টাও চলছে।’

 

রোববার সরেজমিন চকবাজার থানায় গিয়ে দেখা গেছে, পুলিশের একটি টিম চকবাজার থেকে বস্তাভর্তি আলামত সংগ্রহ করে রাখছেন। ঘটনাস্থলের রঙিন ছবিগুলো যাচাই-বাছাই করছেন।

 

পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, এই আগুনের ঘটনায় ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন, রাজউক, বিস্ফোরক অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট সেবা প্রতিষ্ঠানসমূহের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কোনো গাফিলতি ছিল কি না- তাও খতিয়ে দেখে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হবে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে অনানুষ্ঠানিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

 

চকবাজার থানা সূত্র জানায়, এ ঘটনায় ইতোমধ্যে স্থানীয় ১৫ থেকে ২০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পুলিশের সঙ্গে তদন্তে কাজ করছে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট।

 

মর্মান্তিক এই ঘটনার বাদী স্থানীয় মো. আসিফ। তার বাবা জুম্মন এই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন। রোববার আসিফ বিবিসি জার্নালকে বলেন, ‘মামলার তিন দিন হলো আসামিদের কাউকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পেরেছে বলে শুনিনি। এই এলাকায় কেমিক্যাল ব্যবসা থাকা উচিত না। কেমিক্যাল ছিল বলেই আগুনের ভয়বহতা বেড়েছিল। আর আমার বাবাসহ এতো এতো প্রাণ চলে গেলো। এর আগে একবার আমরা জোরালো প্রতিবাদ করেছিলাম। কিন্তু কাজ হয়নি। এবার সময় এসেছে সবাই সংঘবদ্ধ হয়ে এই এলাকায় কেমিক্যাল ব্যবসা সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ করা। আর এই অগ্নিকাণ্ডে যারা দোষী বা যাদের দায় রয়েছে তাদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়।

 

মামলার এজাহারে ১০-১২ জন অজ্ঞাত আসামিসহ আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ওয়াহেদ ম্যানশনে বিভিন্ন তলায় দাহ্য পদার্থের গুদাম ভাড়া দেয়ায় তাদের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে। তাদের অবৈধ গুদামের কারণে আগুনের ভয়াবহতা বেড়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ৬৭ প্রাণের পাশাপাশি এই আগুনে ক্ষতি হয়েছে মোট ২০ কোটি টাকার।

 

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, উল্লেখিত দুই আসামি (হাসান ও সোহেল) তাদের চার তলা বসতবাড়ির বিভিন্ন ফ্লোরে দাহ্যপদার্থ ক্রয়-বিক্রয়কারীদের নিকট হতে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য নির্মিত বাড়িতে ফ্যামিলি ভাড়া না দিয়ে আগুন লেগে মানুষের জীবন এবং মালালমাল ধ্বংস হতে পারে জেনেও অবৈধভাবে দাহ্য পদার্থ কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের নিকট গোডাউন ভাড়া হিসেবে ভাড়া দিয়েছেন।

 

মামলাটি পেনাল কোড ৩০৪ (ক)/৪৩৬/৪২৭/৩৪ পেনাল কোড ১৮৬০ এ দায়ের করা হয়েছে। এটি অবহেলাপূর্বক অগ্নিসংযোগের ফলে মৃত্যু ঘটানোসহ ক্ষতি সাধনের অপরাধ। তবে তদন্তে কারও ইচ্ছাকৃত গাফলতি বা অবহেলা পাওয়া গেলে মামলাটি হত্যা মামলার ধারা যোগ করা হবে।

 

উল্লেখ্য, গত বুধবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাতে পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার ৬৪ নম্বর ওয়াহেদ ম্যানশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এঘটনায় এপর্যন্ত মোট ৬৭ জন নিহত হয়েছে। আহত ও দগ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৪১ জন। এদের মধ্যে দুইজনকে নিবিড় পর্যবেক্ষন কেন্দ্র- আইসিইউতে রাখা হয়েছে। বাকীদের অবস্থাও আশংকাজনক।

 

এঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৫ সদস্য, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ১১ সদস্য এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১২ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।